ভাটি বাংলা ডেস্ক: ২৭ আগস্ট ২০২৪ , ৩:০৫:৩৮ অনলাইন সংস্করণ
কথায় বলে, মানীর মান আল্লাহ রাখেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)র বেলায়ও যেন ঘটেছে তাই। মাফিয়া সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারত আশ্রয় নিলেও তার লেসপেন্সারখ্যাত দুদকের তিন শীর্ষ কর্তা রয়ে গেছেন বহাল তবিয়তে।
মরু-ঝড়ে বালুর ভেতর মাথা গুঁজে থাকা উটের মতোই মাথা গুঁজে আছেন তারা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিলো দুর্নীতি মুক্ত দেশ গড়া। দুদকের বিরুদ্ধে স্লোগান হয়েছে। দুর্নীতি ও দুদক বিরোধী গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায় থেকে দাবি উঠেছে দুদকে ঢেলে সাজানোর। লিগ্যাল নোটিশও দেয়া হয়েছে। পদত্যাগের পক্ষে এসবকেই ‘যথেষ্ট’ মনে করছেন না দুদকের শীর্ষ ব্যক্তিরা।
হাসিনার নিয়োগ দেয়া প্রধান বিচারপতি, আপিল বিভাগের বিচারপতিম এনবিআর চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণরসহ সামরিক-বেসামরিক প্রতিষ্ঠান ও দফতরের শীর্ষ কর্মকর্তারা পত্রপাঠ বিদায় নিয়েছেন। টপাটপ পড়ে যাচ্ছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা। অথচ দিব্যি চেয়ারের হাতল আকড়ে আছেন দুদকের তিন শীর্ষ কর্মকর্তা। তাদের ভাবখানা এমন যে, বাংলাদেশে তেমন কিছুই ঘটেনি।
অবোধ শিশুর মতোই না বোঝার ভ্যাক ধরে আছেন তারা। ফেভিকল আঠার মতোই ক্ষমতার চেয়ারে আটকানো তাদের শরীর। স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বৃহৎ স্টেকহোল্ডার দুদকের তিন শীষ কর্মকর্তা-মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ ( চেয়ারম্যান), মো: জহুরুল হক (কমিশনার) এবং মোছা: আসিয়া খাতুন (কমিশনার) । স্বৈরাচারের শেষ চিহ্ন হিসেবে তারা বসে আছেন আওয়ামী ঝাণ্ডা ধরে। নিয়মিত অফিস করছেন। ১৫ আগস্টকে ‘জাতীয় শোক দিবস’ গণ্য করে কেউ কেউ ধারণ করেছেন কালো কাপড়। নারী কর্মকর্তারা পরিধান করেছেন কালো শাড়ি। কমিশনও সমানে স্বাক্ষর করে চলেছেন বিভিন্ন নথি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের আস্থা কুড়াতে হাসিনা সরকারের চ্যালা-চামুন্ডাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছেন নিজ থেকেই। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চার্জশিট দিয়ে সেই মামলা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। ক’দিন আগেই যারা বিশ্ববরেণ্য নোবেল বিজয়ীকে ‘অর্থ আত্মসাৎকারী’, ‘অর্থ পাচারকারী’ সাব্যস্ত করে মামলা করলো। চার্জশিটও দাখিল করলো। সেই তারাই এখন সচেষ্ট হয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের আস্থা অর্জনে। যদিও আইনত: স্বশাসিত (কার্যত: হাসিনার অধীন) স্বাধীন সংস্থা দুদকের এ হেন ক্লাউনসুলভ কাণ্ড-কারখানা নতুন নয়। রঙ পাল্টাতে গিরগিটিরও হয়তো কিছুটা সময় লাগে। দুদকের লাগে মাত্র কয়েক সেকেন্ড। যে থুতু দুদক মাটিতে ফেলেছে, সেই থুতুই চেটে খেয়েছে সরবার আগে। এভাবে পেশাদারিত্ব বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রশ্নে সংস্থাটির এমন আচরণ জাতি এবং বিশ্বের কাছে নিজেদের অবস্থান রীতিমতো ন্যাংটো করে দিয়েছে। প্রমাণ করে দিয়েছে যে, দুর্নীতি দমনের নামে দুদক মূলত: হাসিনার মাফিয়াতন্ত্র বজায় রাখার শস্তা যন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অনুসন্ধান-তদন্তের নামে প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার কাজই ছিলো দুদকের। তাদের মতে, হাসিনার দেড় দশকের পাপের সম ভাগিদার দুদক। দীর্ঘ দিন শেখ হাসিনার ফুটফরমায়েশ খেটে অভ্যস্থ এ প্রতিষ্ঠানটির কর্তা ব্যক্তিরা এখন মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের ফুটফরমায়েশ খাটার। যদিও বিশ্লেষকরা মনে করেন, দেড় দশকের দুর্নীতি,ব্যাংক লুট,পাচার, বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিচার শেখ হাসিনার গঠিত এই কমিশন দিয়ে করানো অসম্ভব।
বরং শেখ হাসিনার প্রলম্বিত মাফিয়াতন্ত্রের অখন্ড অংশ হিসেবে বর্তমান কমিশনকে আগে বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন। দুদক পুনর্গঠনের পর প্রথম কাজটিই হতে হবে বর্তমান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আব্দুল্লাহর কমিশনের দুর্নীতির বিচার। পর্যায়ক্রমে ইকবাল মাহমুদ কমিশন, গোলাম রহমান কমিশন, মো: বদিউজ্জামান কমিশন এবং লে: জে: (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরী কমিশন সদস্যদেরকে বিচারের আওতায় আনা। প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যকর অর্থে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থায় উন্নীত করতে হলে কাজটি করতে হবে নিজ ঘর থেকে। বর্তমান কমিশনকে উৎখাত করে বিগত দুদক চেয়ারম্যান এবং কমিশনার, মহাপরিচালক,পরিচালক পর্যন্ত সকল কর্মকর্তা-কর্মকর্তার সম্পদ বিবরণী তলব্, যাচাই, দুর্নীতির তদন্ত, সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ, জিজ্ঞাসাবাদ এবং অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ। পালিয়ে যাওয়া সরকারের দুর্নীতির তদন্ত বিদ্যমান কমিশনকে দিয়ে সম্ভব নয়। তাই জরুরিভিত্তিতে প্রয়োজন দুদক পুনর্গঠন। দুদক আইনে উল্লেখিত কথিত ‘সার্চ কমিটি’র কার্যকর করতে বিধি প্রণয়ন জরুরি। সেই বিধি অনুসারে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে। দুদককে আমলা মুক্ত করতে হবে। তদন্ত সাপেক্ষে মুখোমুখি করতে হবে বিগত সরকারের দুর্নীতিবাজ আমলাদের। প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়ে যেতে হবে সরকার ও দলীয় প্রভাবের উর্ধ্বে।
দুদকে কেন কোনো পরবর্তন আসছে না ? চেয়ারম্যান-কমিশনার কেন পদত্যাগ করছেন না ? এমন প্রশ্নের উত্তরে মিলেছে কিছু মজাদার তথ্য। কমিশনঘনিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, সরকার পরিবর্তনকে তিন সদস্যের কমিশন কোনো ‘পরিবর্তন’ই মনে করছেন না। তাদের যুক্তি হচ্ছে, সরকারের সঙ্গে দুদকের কোনো সম্পর্কই নেই ! কারণ, আইনগতভাবে এটি স্বশাসিত স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। আইনের ২৪ ধারা মোতাবেক কমিশনারগণ এই আইনের অধীন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবেন। দ্বিতীয়ত: আইনের ১০(১) (৩) অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারক যেরূপ কারণ ও পদ্ধতিতে অপসারিত হতে পারেন, সেরূপ কারণ ও পদ্ধতি ব্যতিত কোনো কমিশনারকে অপসারণ করা যাবে না। আইনের এই দু’টি উপÑধারাকে বর্তমান কমিশন তাদের ‘রক্ষাকবচ’ মনে করছে। যদিও বাস্তবতা ভিন্ন। এ মহূর্তে বিচারপতি অপসারণের কোনো পদ্ধতি বিদ্যমান নেই। ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ ঝুলছে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল রায়ের মধ্যে। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়ায় বিচারপতি অপসারণের এখতিয়ার কাউন্সিলের হাতে থাকবে নাকি জাতীয় সংসদের হাতে যাবে-এই সুরাহা এখনো হয়নি। ফলে উচ্চ আদালতের বিচারক অপসারণের আইনসিদ্ধ কোনো পদ্ধতি এখন নেই। তা সত্ত্বেও আপিল বিভাগের ৬ বিচারপতিকে অপসারণ করা হয়েছে কিংবা ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে নিজেরাই পদত্যাগ করেছেন।
দুদক কমিশনারগণ মনে করছেন, তাদের বিষয়ে ছাত্র-জনতার তেমন একটা ক্ষোভ নেই। সকল ক্ষোভ শুধু শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামীলীগের ওপর। বিগত দেড় দশকে দুদক সম্পর্কে মানুষের যে ধারণাসূচক সৃষ্টি হয়েছে আওয়ামী সরকারের সুবিধাভোগী কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করলেই হয়তো সেই ধারণার প্রশমন ঘটবে। এ চিন্তা থেকে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী যাদেরকে হত্যা মামলায় আকট ও গ্রেফতার করছে-তাদের বিরুদ্ধে সপ্রণোদিত হয়ে অনুসন্ধান-তদন্ত শুরু করেছে। যদিও এসব ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে লুটপাট ও অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দুদকে আগে থেকেই ছিলো। হাসিনার শাসনামলে দুদক অত্যন্ত সচেতনভাবে তাদের কেশাগ্রও স্পর্শ করেনি।
কমিশন সদস্যরা এমন যুক্তিও দেয়ার চেষ্টা করছেন যে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে থানায় আগুন দেয়া হয়েছে। পাসপোর্ট অফিস ধ্বংস করা হয়েছে। ভূমি অফিসসহ বহু সরকারি দফতরে হামলা হামলা হয়েছে। পক্ষান্তরে রাজধানীর কেন্দ্রে থাকা ১, সেগুনবাগিচাস্থ দুদক কার্যালয়ে একটি ঢিলও পড়েনি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বহু মিছিল এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করেছে। সে সময়ও আন্দোলনকারীরা প্রতিষ্ঠানটিকে সম্মান করেছে। সুতরাং বর্তমান কমিশন স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো ধরণের ‘ত্রুটি’ খুঁজে পাচ্ছে না।
আইনের আরো ২টি ধারাকে বর্তমান কমিশনের নিজেদেও ‘রক্ষাকবচ’ বলে মনে করছে। একটি হচ্ছে, দুদক আইনের ১০ (১) ধারা। তাতে বলা হয়েছে, কমিশনারগণ প্রেসিডেন্টের কাছে ১ মাসের লিখিত নোটিশ প্রেরণপূর্বক স্বীয় পদ ত্যাগ করতে পারবেন।
আরেকটি দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ এর (২) উপধারা। তাতে বলা হয়েছে, কমিশনারগণ পদত্যাগ সত্ত্বেও পদত্যাগপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি, প্রয়োজনবোধে, পদত্যাগকারী কমিশনারকে তার দায়িত্ব পালনের জন্য অনুরোধ করতে পারবেন। গত ৫ আগস্ট স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের তখত তাউস চুরমার হয়ে যাওয়ার দিনটিকে যদি প্রথম দিন ধরা হয়, তাহলে ওইদিন থেকে পরবর্তী এক মাস হবে আগামি ৫ সেপ্টেম্বর।
যদিও তারা পদত্যাগ করেছেন-মর্মে গতকাল সোমবার পর্যন্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায় নি। রাষ্ট্রপতিও তাদের দায়িত্ব পালনে জন্য অনুরোধ করেছেন বলে জানা যায় না। অর্থাৎ বর্তমান কমিশনের টার্গেট নিয়োগকর্তা হিসেবে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার এজেন্ডা বাস্তবানে নির্ধারিত মেয়াদ (পাঁচ বছর) পূর্ণ করা।
আইনি আবরণে ‘হাসিনার লোক’ : দুদক আইনের ৭ ধারায় কমিশনার নিয়োগের একটি ‘বাছাই কমিটি’ উল্লেখ রয়েছে । সে অনুযায়ী ৫ সদস্যের এ কমিটি কমিশনার পদে নিয়োগ উপযোগী ব্যক্তিদের নাম সুপারিশ করবে। প্রধান বিচারপতি মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারকের নেতৃত্বে কাজ করবে।
প্রধান বিচারপতি মনোনীত হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক,বাংলাদেশের মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিবদের মধ্য থেকে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিব। এর সঙ্গে এই মর্মে শর্ত রয়েছে যে,যদি উক্তরূপ অবসরপ্রাপ্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে পাওয়া না যায় অথবা তিনি বাছাই কমিটির সদস্যপদ গ্রহণে অসম্মত হন, তাহা হইলে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিবের অব্যবহিত পূর্বের অবসরপ্রাপ্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে নিয়ে এ কমিটি বাছাই কার্যক্রম চালাবে। বাছাই কমিটি, কমিশনার নিয়োগে সুপারিশ প্রদানের উদ্দেশ্যে, উপস্থিত সদস্যদের অন্যুন ৩ (তিন) জনের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কমিশনারের প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে দুই জন ব্যক্তির নামের তালিকা প্রণয়ন করে ধারা ৬ এর অধীন নিয়োগ প্রদানের জন্য রাষ্ট্রপতির নিকট প্রেরণ করবে। অন্যুন ৪ (চার) জন সদস্যের উপস্থিতিতে বাছাই কমিটির কোরাম গঠিত হবে।
আপাত: দৃষ্টিতে এ প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। বাস্তবতা হচ্ছে, বিগত ৩টি কমিশন গঠনের পুরো প্রক্রিয়াই সম্পন্ন হয়েছে শেখ হাসিনার নির্দেশে। আইনে নির্দিষ্ট একটি ধারা থাকলেও ওই বাস্তবায়নে কমিটি কি পদ্ধতিতে ‘বাছাই’ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন-সেটি উল্লেখ নেই। ‘বাছাই কমিটি’র কার্যক্রম পরিচালনার কোনো বিধি নেই।
দুদক কমিশনার হওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের নামসমুহ কিভাবে কমিটির হস্তগত হবে- সেটি স্পষ্ট নয়। ফলে যেটি হয়েছে, বিভিন্ন শ্রেণিপেশা এবং সুশীল সমাজ থেকে কমিশনার হওয়ার উপযোগী ব্যক্তিদের নাম পাঠালেও বাছাই কমিটির কার্যক্রমটি চালানো হয় গোপন প্রক্রিয়ায়। ফলে যে যত নামই প্রস্তাব করুন না কেন, শেখ হাসিনার প্রস্তাবিত ব্যক্তিদের নিয়েই দুদকে যথাক্রমে: চেয়ারম্যান এবং কমিশনার নিযুক্ত হয়েছেন। বাছাই কমিটি প্রেসিডেন্টের কাছে একটি পদের বিপরীতে ২জনের নাম প্রস্তাব করে। প্রেসিডেন্ট সেখান থেকে প্রতিটি পদে একজন করে নিয়োগ দেন। এ পর্যায়টি আপাত: স্বচ্ছ মনে হলেও এখানেও রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি।
প্রেসিডেন্ট দুদক কমিশনারদের নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর করার আগে সেটির সারসংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর দফতরে পাঠাতে হয়। সে হিসেবে শেখ হাসিনার অনুমোদন সাপেক্ষে প্রেসিডেন্ট দুদক কমিশনার নিয়োগ দেন। সংসদীয় পদ্ধতিতে রাষ্ট্রপরিচালিত হওয়ায় রাষ্ট্রপতির নামেই রাষ্ট্রের সকল কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন রাষ্ট্রপ্রধান-সরকার প্রধান নন। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির শুধুমাত্র ২টি ক্ষমতা স্বাধীনভাবে প্রয়োগের এখতিয়ার রয়েছে। একটি হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ। আরেকটি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ। দুদক কমিশনার পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করতে হয় প্রেসিডেন্টের। সংবিধান ও আইনের এই ফোকরে দুদক চেয়ারম্যান এবং কমিশনার নিয়োগ দিয়েছেন মাফিয়া সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কথিত ‘বাছাই কমিটি’র আইওয়াশ দিয়ে ২০২১ সালের ৩ মার্চ দুদক চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় শেখ হাসিনার একান্ত অনুগত অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র আমলা মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ এবং কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত আওয়ামী বিচারক মো: জহুরুল হককে। বলাবাহুল্য, বাছাই কমিটির কাছে অনেক দক্ষ, যোগ্য,নিরপেক্ষ ও পেশাদার ব্যক্তিদের নামের বায়োডাটা জমা হলেও কমিটি সেসব খুলেও দেখেনি। গণভবন থেকে যেসব নাম এসেছে সেগুলোই নিয়োগের জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয় তৎকালিন প্রেসিডেন্ট মো: আবদুল হামিদের দফতরে। আপিল বিভাগের তৎকালিন বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বে হাইকোর্ট বিভাগের তৎকালিন বিচারপতি (সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও আত্মস্বীকৃত শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদও বটে) এম. ইনায়েতুর রহিম, তৎকালিন মহাহিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী,পিএসসি’র তৎকালিন চেয়ারম্যান মো: সোহরাব হোসাইন এবং সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা। বাছাই কমিটিতে তারা নামমাত্র থাকলেও শেখ হাসিনার ইচ্ছের বাইরে তারা কিছুই করেননি।
বলাবাহুল্য, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে অবসরে যাওয়া সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ আপাত: ‘ক্লীন ম্যান’ হিসেবে পরিচিত। তা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে রয়েছে সচিব থাকাকালে একাধারে বৃটিশ আমেরিকান টোব্যাকো’ (বিএটি)র পরিচালনা পর্ষদেও দায়িত্ব পালন করেন। বিএটি থেকে তিনি বেতন-ভাতা উত্তোলন করতেন। বিএটি’র সঙ্গে এখনো তার সম্পর্ক রয়েছে বলে জানা যায়। তার এক সন্তান প্রতিষ্ঠানটিতে চাকরি করছেন।
শেখ হাসিনার সঙ্গে দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহর ঘনিষ্টতার বহু প্রমাণ এ প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। আপাত: ‘নেহায়েত ভদ্রলোক’ হলেও প্রতিহিংসায় অতুলনীয়। চট্টগ্রামের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী, পেট্রোবাংলার নিয়োগ জালিয়াতি, জাতীয় গ্যাস সম্পদ লুট, রোহিঙ্গাদের নামে বাংলাদেশী পাসপোর্ট ইস্যুর অভিযোগে এনআইডি প্রকল্প কর্মকর্তা, পাসপোর্ট অফিসের দুর্নীতিবাজ রাঘব বোয়াল, মাতারবাড়ি প্রকল্পে ভূমিঅধিগ্রহণ দুর্নীতিতে জড়িত আমলা হেলালউদ্দিনসহ কিছু রাঘব বোয়ালের বিরুদ্ধে মামলা রুজুর সুপারিশ করেছিলেন উপ-সহকারি পরিচালক মো: শরীফউদ্দিন। এ কারণে উল্টো শরীফকে ‘দুর্নীতিবাজ’ আখ্যা দিয়ে তার চাকরি খেয়েছেন মঈন উদ্দীন আবদুল্লাহর কমিশন।
তার কর্মকাল জুড়ে রাঘববোয়াল কোনো দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় নি
। এস.আলমের ব্যাংক লুট, সরকারি সম্পত্তি এবং মালিকানা নিয়ে বিরোধপূর্ণ সম্পত্তির দলিল বন্ধক রেখে ইসলামী ব্যাংক, অগ্রনী ব্যাংক,ডাচ বাংলাসহ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুন্ঠনকারী ‘নোমান গ্রুপ’, শহীদুল আহসানের এজি গ্রুপ, সামিট গ্রুপের মতো চিহ্নিত লুটেরাদের কেশাগ্রও স্পর্শ করেননি। ব্যস্ত রয়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী, নিম্ন বেতনের সরকারি কর্মচারির মতো চুনোপুটির অনুসন্ধান-তদন্তে। দুর্নীতিবাজদের গ্রেফতার সম্পূর্ণ রূপে বন্ধ করে দেন। অব্যাহত রাখেন নোটিশ বাণিজ্য, তলব-জিজ্ঞাসাবাদের হয়রানি।
মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহর সঙ্গেই নিয়োগ দেয়া হয় আরেক বিতর্কিত অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ (৮৩ ব্যাচ) ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মো: জহুরুল হককে। বিচারক থাকাকালেই তার বিরুদ্ধে ব্যপক দুর্নীতির অভিযোগ ছিলো।
বিডিআর পিলখানা হত্যা মামলার শুরুর দিকে তিনি বহু অভিযুক্তকে অর্থের বিনিময়ে ছাড় দিয়েছেন বলে জানা যায়। আওয়ামী আমলেই তিনি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তার বিরুদ্ধে রায় কেনা বেচা, অর্থের বিনিময়ে জামিন প্রদানের কানাঘুষা ছিলো অন্য বিচারকদের মুখে মুখে। তার দুর্নীতির বিষয়টি ছিলো ওপেন সিক্রেট। এছাড়া দুদক দায়েরকৃত অনেক দুর্নীতি মামলায় তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জামিন প্রদান, তাদের পক্ষে রায় দিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়েছেন-মর্মে অভিযোগ রয়েছে। ভুল বিচার ও অন্যায় আদেশ প্রদানের কারণে তাকে একাধিক বার হাইকোর্ট তাকে তলব করেন।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ থাকাকালে তার হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি নিয়োগ লাভের সম্ভাবনা ছিলো। কিন্তু ব্যাপক দুর্নীতির কারণে তাকে হাইকোর্টে নেয়া হয়নি। পরে তাকে বিটিআরসি’র সদস্য হিসেবে পুনর্বাসন করা হয়। পরে কিছু দিনের জন্য চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন। এ সময় তার সঙ্গে যোগাযোগ হয় শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের। সে সময় আওয়ামীলীগ নেতা মির্জা আজমের মাধ্যমে জয়ের কাছে সুপারিশ যায় জহুরুল হককে দুদক কমিশনার করার। সে অনুযায়ী তাকে দুদকে পুনর্বাসন করা হয়। এ হেন দুর্নীতিবাজ কমিশনার দুদকে রয়েছেন বহাল তবিয়তে। তার বিরুদ্ধে রয়েছে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জন, বেনামে ক্লিনিক ব্যবসার (এএমজেড হাসপাতাল) অভিযোগ। এ ছাড়া দুর্নীতি মামলার চার্জশিট থেকে নাম বাতিল করা এবং দুদক কর্মকর্তাদের পদোন্নতি প্রদানের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। টাকা নিয়েও কাজ করেননি-এমন অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
শেখ হাসিনা পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্টতার মানদণ্ডে গতবছর ১৩ জুন দুদক কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোসা: আছিয়া খাতুন। কর্মজীনের প্রায় পুরোটাই তিনি নানাভাবে কাটিয়েছেন বিদেশের মাটিতে ।
মাঠপর্যায়ে স্বল্প অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই নারী আমলাকে দুদকে বসানো হয় বিশেষ এজেন্ডা দিয়ে। তার স্বামী মোকাম্মেল হোসেন বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন। সম্প্রতি তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়। সিভিল এভিয়েশনের বিমান ক্রয়, নিয়োগ ও নির্মাণ কার্যক্রমে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে মোকাম্মেল হোসেন, কয়েকজন প্রকৌশলী এবং সিভিল এভিয়েশনের একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। আছিয়া দুদকে কমিশনার হিসেবে আসার পর সেই অনুসন্ধানের নথি ধামাচাপা দেয়া হয়। শুধু তাই নয়-তিনি কমিশনার (অনুসন্ধান) হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর সিভিল এভিয়েশনের বিরুদ্ধে চলমান অইেশ অনুসন্ধান-তদন্ত থেমে যায়।
দুর্নীতি আর লুটপাটের মাফিয়া সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেছেন। কিন্তু দুদকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রেখে গেছেন তার অনুগত, অনুসারী লেসপেন্সারদের। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর অনেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে মানে মানে কেটে পড়েন। কিন্তু নির্লজ্জ্বের মতো বহাল তবিয়তে রয়ে গেছেন দুদকের তিন শীর্ষ কর্মকর্তা। তাদের বিতাড়িত না করে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী কোনো এজেন্ডাই বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
সূত্রঃ ইনকিলাব