প্রতিনিধি ১৮ ডিসেম্বর ২০২২ , ২:৫২:৫৩ অনলাইন সংস্করণ
আল-হেলাল,সুনামগঞ্জ থেকে: ৫২ বছর পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারন করলেন সুনামগঞ্জের যোদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা এস.এন.এম মাহমুদুর রসুল। তিনি বলেন,জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবদ্ধশায় চন্ডিপুর নিবাসী নেজাবত আলী কে সভাপতি,আলহাজ¦ আব্দুল কদ্দুছ কে সাধারন সম্পাদক,ক্ষিতিশ নাগ,রনদা প্রসাদ রায় চৌধুরী,নিশী চৌধুরী,আব্দুর রউফ,আব্দুল আউয়াল,আলতাব উদ্দিন ও আমি এস.এন.এম মাহমুদুর রসুল কে সর্বশেষ সদস্য করে দিরাই থানা আওয়ামীলীগের ১১ সদস্য বিশিষ্ট প্রথম কার্যকরী কমিটি অনুমোদন দিয়েছিলেন। এই কমিটির নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু দিরাই থানা সফর করেন।
সেদিন ছিল ১৯৭০ সালের ৭ই অক্টোবর মোতাবেক ২০ শে আশি^ন রোজ বুধবার ঐদিন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামীলীগের সভাপতি ও বাঙ্গালী জাতির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এর শুভাগমন উপলক্ষে সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই থানা সদরে এক বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। বিকেল ৩টায় দিরাই চরাবাজারে থানা আওয়ামীলীগ আয়োজিত এ সভায় ভাষন দান করেন বঙ্গবন্ধু। বক্তব্য রাখেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম।
জাতির জনকের প্রতি সুগভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে হৃদয় মন্দিরে চির জাগরুক থাকা অমর কাব্যের কবি বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ দিরাই থানা ইউনিট কমান্ডের প্রাক্তন ডেপুটি কমান্ডার এসএনএম মাহমুদুর রসুল জানান,৭০ এর জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু বের হয়েছিলেন সাংগঠনিক সফরে।
দিরাই থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি চন্ডিপুর নিবাসী নেজাবত আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় মৎস্য বালু পাথর ধান আর আউল বাউল ফকিরের দেশ দিরাই থানায় বঙ্গবন্ধুর শুভাগমনকে স্বাগত জানিয়ে আরো বক্তব্য রাখেন সিলেট জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে দিরাই শাল্লা জামালগঞ্জ ধর্মপাশা আসনে নৌকা প্রতীকে আওয়ামীলীগের মনোনিত এম.এন.এ পদপ্রার্থী আব্দুস সামাদ আজাদ,সুনামগঞ্জ মহকুমা আওয়ামীলীগ নেতা সাবেক মন্ত্রী দিরাই শাল্লা নির্বাচনী এলাকায় নৌকা প্রতীকে আওয়ামীলীগ মনোনিত এমপিএ প্রার্থী বাবু অক্ষয় কুমার দাশ,সুনামগঞ্জ মহকুমা আওয়ামীলীগের সভাপতি এমএনএ পদপ্রার্থী দেওয়ান ওবায়দুর রেজা চৌধুরী, এমপিএ পদপ্রার্থী এডভোকেট আব্দুর রইছ ও দিরাই থানা আওয়ামীলীগ নেতা আব্দুল কদ্দুছ প্রমুখ।
মহকুমা আওয়ামীলীগ নেতা হোসেন বখত,সৈয়দ দেলোয়ার হোসেন,এডভোকেট খলিলুর রহমান, ছাত্রলীগ নেতা সুজাত আহমদ চৌধুরী,তালেব আহমদ,মুজিবুর রহমান চৌধুরী,সিলেট জেলা আওয়ামীলীগ নেতা দেওয়ান ফরিদগাজী,ইসমত চৌধুরী,ছাত্রলীগ নেতা বাবরুল হোসেন বাবুল,শাহ আজিজুর রহমান ও দিরাই থানা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক আব্দুর রউফ ও আউয়াল মিয়াসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। মাহমুদুর রসুল বলেন,জনসভার পরে নদীতে লঞ্চের মধ্যে দলীয় কর্মীসভায় অক্ষয় কুমার দাশ আমার সাংগঠনিক কর্মকান্ডের প্রশংসা করে বঙ্গবন্ধুকে সংক্ষিপ্ত ব্রিফিং দেন। এসময় বঙ্গবন্ধু আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেন,“তৈরী হয়ে যাও যুবক। প্রাণ নিয়ে প্রতিজ্ঞা করো। ছেড়ে দাও মরণের ভয়। ওরা আমাদের অধিকার দিতে চাইবেনা।
নির্বাচনের পরেই একদফা আন্দোলন করতে হবে”। কথাগুলো তখনকার আওয়ামীলীগ কর্মী,উদীয়মান তরুণ যুবক এস.এন.এম মাহমুদুর রসুল ও তার সহকর্মীদের উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করতে গিয়ে ৭১ এ ট্যাকেরঘাট সাবসেক্টরের প্লাটুন পরবর্তীতে কোম্পানী কমান্ডার এস.এন.এম মাহমুদুর রসুল (ময়না মাস্টার) বলেন,পাক ওয়াটার ওয়েজ নামক লঞ্চযোগে ভৈরব শেরপুর ও আজমেরীগঞ্জ অতিক্রম করে পথিমধ্যে কয়েকটি পৃথক বিশাল জনসভায় ভাষন দান শেষে সকাল ১১টায় দিরাই ডাকবাংলায় এসে পৌছান বঙ্গবন্ধু। সেখানে ভাটি বাংলার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সাথে তিনি এক মত বিনিময় সভায় মিলিত হন।
তাঁর সফরসঙ্গীদের মধ্যে আন্তর্জাতিক ডন পত্রিকাসহ বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকার ১২ জন সাংবাদিকও ছিলেন। ডিসেম্বরের প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের ভবিষ্যত নিয়ে স্থানীয় সকল নেতাকর্মীরা সন্দেহভাজন ছিলেন। এসএনএম মাহমুদুর রসুল ও তার বড় ভাই ভরারগাঁও নিবাসী আওয়ামীলীগের প্রবীণ সংগঠক ভাষা সৈনিক আব্দূন নূর চৌধুরী সন্ধ্যায় পাক ওয়াটার ওয়েজ লঞ্চের দুতালায় সমবেত নেতাকর্মীদের সম্মুখে বঙ্গবন্ধুর কাছে জানতে চেয়েছিলেন,আওয়ামীলীগ কয়টি আসন পাবে। বঙ্গবন্ধু স্বগর্বে বলেছিলেন,২২টি আসনের জন্য সন্দেহ হচ্ছে। তবে সবগুলো আসনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে আমরা জয়ী হবো। তুমুল প্রতিদ্ব›িদ্বতা হবে। ২২টি আসনে পিডিপি ও মুসলিম লীগের প্রার্থীদেরকে যেভাবেই হউক পরাজিত করতে হবে। এজন্য আমাকে একটু পরিশ্রম করতে হবে। এসমস্ত প্রার্থীদের নাম জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু ২২ জনের নাম বললেন। এরা হচ্ছে চট্রগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরী,মৌলানা ফরিদ আহমদ,সুনামগঞ্জের মাহমুদ আলী,খুলনার সবুর খান,কুষ্টিয়ার শাহ আজিজুর রহমান,ফরিদপুরের ওয়াহিদুজ্জামান,আকমল ইবনে ইফসুফ,কাজী কাদের,জমীর উদ্দিন প্রধান,ঢাকার খাজা খয়ের উদ্দিন,নান্দাইলের নুরুল আমিন,বরিশালের আজিজুল হক,পীর মুসলেহ উদ্দিন,আনম ইউসুফ,আতাউর রহমান খান,্এসএম সুলায়মান,আব্দুল জব্বার খান,মশিউর রহমান যাদু মিয়া,রিয়াজ উদ্দিন ভোলা মিয়া প্রমুখ। বাকী ৩ জনের নাম এস.এন.এম .মাহমুদুর রসুলের স্মরণ নেই। সত্যিকার অর্থে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেদিন নৌকা ও আওয়ামীলীগের স্বপক্ষে ব্যাপক জনমত ও গণজোয়ার সৃষ্টি করেছিলেন। যে জোয়ারে পাকিস্তানে পিডিপি ও মুসলিম লীগের তাবেদার স্বৈরশাসকদের মসনদ কেঁপে উঠেছিল। নির্বাচনের ফলাফলে শুধু বঙ্গবন্ধু বা আব্দুস সামাদ আজাদ বিজয়ী হননি। প্রায় সব প্রার্থীরাই বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছিলেন।
যোদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা এস.এন.এম মাহমুদুর রসুল আরও বলেন,বঙ্গবন্ধুর শুভাগমনে আব্দুস সামাদ আজাদের নেতৃত্বে শোসিত বাংলার অবহেলিত ভাটি এলাকার জনগনের পক্ষ থেকে আমরা আওয়াজ তুলেছিলাম,“বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাই। কালনী পৈন্দা কুশিয়ারাসহ সকল ভরাট নদীর খনন চাই। ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ কর করতে হবে। সহজলভ্য কৃষি ঋন ও চাষাবাদের জন্য যান্ত্রিক ব্যবস্থার বন্দোবস্ত কর। জলমহালে মৎস্যজীবিদের অধিকার দিতে হবে। আইয়্যুব গেছে যে পথে ইয়াহিয়া যাবে সে পথে। হৈ হৈ রৈ রৈ খান চোরারা গেল কই। তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা। দিরাই শাল্লার মাটি বঙ্গবন্ধুর ঘাটি। এক দফা এক দাবী ইয়াহিয়া তুই কবে যাবি। ডাক দিয়েছে মুজিব ভাই ইয়াহিয়া তোমার রক্ষা নাই। আইয়্যুব ইয়াহিয়া নিপাত যাক বাঙ্গালী মুক্তি পাক” শ্লোগান ধ্বনী।
মাহমুদুর রসুল বলেন,বঙ্গবন্ধু দুবার দিরাই সফর করেন। ৭৩ এর ৩রা মার্চ সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে নৌকা প্রতীকে সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী আব্দুস সামাদ আজাদের সমর্থনে সর্বশেষ নির্বাচনী জনসভায়ও তিনি এসেছিলেন। ২ বারের আগমনে তাঁকে স্বাগত জানিয়ে বঙ্গবন্ধু,নৌকা ও আওয়ামীলীগ এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে গণসংগীত পরিবেশন করেন বাউল কামাল পাশা (কামাল উদ্দিন) ও বাউল শাহ আব্দুল করিম। জীবনের শেষ ইচ্ছে কি ? জানতে চাইলে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন,আমার জীবনে চাওয়া পাওয়ার কিছুই নেই।
তবে মৃত্যুর আগে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সাথে অন্তত একটি বারের জন্য সাক্ষাত করে দুটি কথা বলতে চাই। স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত দিরাই থানার ভাটিপাড়া গ্রামের কৃতিসন্তান ডাঃ প্রপেসর এম.ইউ কবির চৌধুরী বলেন, ১৯৭১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর বিকাল ৩ ঘটিকায় সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া ইউনিয়নের বাবনিয়া গ্রামে পাক হানাদার বাহিনীর প্রায় দেড়শ সৈন্য ঝাপিয়ে পড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর। এসময় কোম্পানী কমান্ডার আব্দুল মজিদ চৌধুরী মানিকসহ সকলেই নৌকায় বিশ্রামে ছিলেন। বিশ্রামরত অধিনায়কসহ সকল মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন মজিদ কোম্পানীর সহ অধিনায়ক দিরাই থানার ভরারগাঁও নিবাসী এস.এন.এম মাহমুদুর রসুল ও তার সহযোদ্ধা আরশ আলী। এ অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান লক্ষ্য করে পাক বাহিনী অকস্মাৎ হামলা চালায়। কমান্ডার এস.এন.এম মাহমুদুর রসুল ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আরশ আলী দুজনেই তাৎক্ষনিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। হানাদার বাহিনীর সাথে মুক্তিবাহিনীর মোট ৪ ঘন্টা সম্মুখযুদ্ধ হয়। এক ঘন্টার ব্যবধানে আরো ৫ জন সহযোদ্ধা যোগ দেন তাদের সাহায্যার্থে। ৪ ঘন্টা যুদ্ধের পর শত্রæবাহিনী পলায়ন করে। কিন্তু পলায়নরত পাক বাহিনীর গুলিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা আরশ আলী শহীদ হন যুদ্ধের ময়দানেই।
মুখোমুখি যুদ্ধের এক ঘন্টা পরে গুলি শেষ হয়ে গেলে সাতরিয়ে নৌকা থেকে গুলি আনতে গিয়ে বামহাতে গুলিবিদ্ধ হন এসএনএম মাহমুদুর রসুল।
উঠার সাথে সাথে বাম হাতে ও পরে ডান পায়েও গুলি লাগে তার। ভাটিপাড়াতে দুজন পল্লী চিকিৎসক ও একজন মেডিকেলের ছাত্র হিসেবে আমি ডাঃ প্রপেসর এম.ইউ কবীর চৌধুরী তাদেরকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেই। পরবর্তীতে টেকেরঘাট সাবসেক্টর কোয়ার্টার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার জন্য আমি গুরুতর আহত মুক্তিযোদ্ধাদেরকে রেফার্ড করি। সেখানে কর্তব্যরত ডাঃ হারিছ উদ্দিন,ডাঃ নজরুল হক ও ডাঃ জালাল উদ্দিন তাদেরকে চিকিৎসা দেন। এর আগে আরশ আলী ও এস.এন.এম মাহমুদুর রসুলগং তাহিরপুর,বেহেলী,নোয়াগাঁও গ্রামে পাক বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহন করেন বলে জানতে পেরেছি।
উল্লেখ্য ১৯৫৩ সালের ২০ জানুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই থানার ভরারগাঁও গ্রামে এক সম্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন যোদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা এস.এন.এম মাহমুদুর রসুল। ৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর দিরাই সফর ও আব্দুস সামাদ আজাদের এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি মহান পেশা শিক্ষকতায় যোগদান করেন।
তাঁর জেষ্ট ভ্রাতা আব্দূর নূর চৌধুরী যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে এবং তিনি ৭০ এর এমএনএ ও ৭৩ এর সংসদ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী আব্দুস সামাদ আজাদের ঘনিষ্ট রাজনৈতিক সহকর্মী ছিলেন। বর্তমানে উপজেলা সদরের মজলিশপুর গ্রামে স্বপরিবারে অবসর জীবন যাপন করছেন এই বীর সেনানী।